♦ঘটনার নামে নিরবিচ্ছিন্ন অঘটনের মেগাসিরিজ….

0
148
ThatQuick Blog

======================================
নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এসি বিস্ফোরণে লাশের সারির ঘটনা তামাদির দিকে। মসজিদটাই যেখানে অবৈধ, সেখানে এসব মৃত্যু নিয়ে বেশি মাতামাতির কিছু নেই-এমন একটি যুক্তি ও মতামত আরোপের চেষ্টা বেশ স্পষ্ট। অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডও বাসি ঘটনার দিকে চলে গেছে। সিনহা ঘটনার রেশের মধ্যেই হাতুড়িপেটায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের জান নিয়ে টানাটানির ঘটনাও বিচ্ছিন্ন।
ইউএনও একটি উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। দৃর্বৃত্তরা যখন প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির গায়ে হাত তোলার সাহস পায়- তখন ওই জনপদেরই কেবল নয়- রাষ্ট্রের সার্বিক আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে দুর্বৃত্তরা উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তির গায়ে হাত তোলার সাহস পায়-সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। দৃর্বৃত্তরা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনও ওয়াহিদাকে কুপিয়েছে তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে। একজন ইউ্এনওকে কুপিয়ে মরণাপন্ন করে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্মতৎপরতাকেও কিন্তু পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে। একজন ইউএনও সরকারি বাসভবনে নিরাপদ না থাকলে রাষ্ট্রের সার্বিক চিত্রটা যে কোনো বিবেকবান মানুষের জন্যই ভীতিকর হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ বলতে চান, হাতুড়ি যখন ভিন্নমতের শরীরে আঘাত করেছিলো, তখন ব্যবস্থা নিলে তা ইউএনওর মাথা পর্যন্ত না-ও পৌঁছাতে পারতো। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, লাইনের লিকেজ থেকেই গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয় নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বাইতুল সালাহ জামে মসজিদটি। তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে সেই লিকেজ লাইন মেরামত করার কথা বলা হলে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। মসজিদ কমিটি জানিয়েছে, তারা টাকাটা যোগাড় করতে নাপারায় সেটি আর মেরামত করা হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ ও তথ্যের আড়ালে আরো কতো জিজ্ঞাসা থেকে যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের প্রধানের ভাষ্যমতে “মসজিদের ফ্লোরের নিচ দিয়ে একটি গ্যাসের লাইন গেছে। সেই লাইন থেকে গ্যাস লিক হয়ে বদ্ধ মসজিদের ভেতরে জমা হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডিজির বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন উঠে- মসজিদের ফ্লোরের নিচ দিয়ে গ্যাস লাইন যায় কিভাবে? নিশ্চয় গ্যাস লাইন আগে গেছে, তারপর সেই লাইনের উপর মসজিদ তৈরি হয়েছে? গ্যাস লাইনের উপর মসজিদ তৈরি কারা করেছে? কারা এই মসজিদ ভবন তৈরির অনুমোদন দিয়েছে? মসজিদ কমিটির দায়িত্বে যারা, স্থানীয় প্রশাসন- তারা কি জানতেন না- মসজিদটি নির্মানের ক্ষেত্রে একটি বেআইনি কাজ করা হয়েছে?
কেবল গ্যাস নিঃসরণ বা অন্য কোনো কারণ সাব্যস্ত করার মধ্য দিয়ে এ ঘটনার উপসংহারে পৌঁছা যায় না। কে না জানে, বিদ্যুৎ, ওয়াসা এবং গ্যাস অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্তরা দরজা বন্ধ করে একা একা ঘুষ খায় না। এই ঘুষের ভাগ অনেক উপর পর্যন্ত যায়। গ্যাসের লাইনের ওপর কীভাবে মসজিদ নির্মাণ হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংসদে জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। যেখানে সেখানে গড়ে উঠা মসজিদগুলোর অনুমতির বিষয় খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জ বা এ ধরনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আর অন্য কারো কথা খাটে না। মানায়ও না।
ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার মতো টানা গত এক দশকের বেশি সময়ে লুটপাট, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, জালিয়াতিসহ নানা ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের লোকদের জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে। প্রায় সব ঘটনাকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালানো হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডকেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা চলমান। এর আগে পিলখানায় ৫৭/৫৮ জন সেনা অফিসার, বিশ্বজিত, অভিজিৎ, নুসরাত, তনু, মিতু, খাদিজা, মিন্নি, নয়ন বন্ড, একরাম হত্যাসহ বহু ঘটনাকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাম দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। ওইসব চেষ্টা কম-বেশি সফলও হয়েছে। তলানিতে চলে গেছে বহু ঘটনা। মানুষও ভুলে গেছে। কয়েকদিন আগে ভেজালে রাজি না হওয়ায় পিডাব্লিওডি’র ইঞ্জিনিয়ারকে পিটিয়ে আধমরা করার ঘটনা ধামাচাপা পড়তে সময় লাগেনি। করোনা মহামারিতে দেশ-দুনিয়া লণ্ডভণ্ডের মধ্যে ধারনা হয়েছিল অন্তত জীবন-মরণের এ সন্দ্বিক্ষনে অপরাধীরা কিছুটা হলেও হাত গুটিয়ে নেবে। স্রষ্টার ভয়ে বা মরণের ভয়ে বা পাপে-তাপে কিছুটা মানবিকতার তাড়না জাগবে। টান পড়বে অপকর্মের লাগামে। ধারনা বাস্তব হয়নি।
চুরি, চেচরামি, ঠকবাজি, কালোবাজারি কোনটাতে কমতি হয়নি। বরং আরো বেড়েছে। তাও বিচ্ছিন্ন নয়। একেবারে ধুমছে। নিরবিচ্ছিন্নভাবে। করোনা চিকিৎসায় এমন কি পজেটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে বাণিজ্যেও বুক কাঁপেনি ঠকবাজদের। সুস্থ্ হওয়া করোনা রোগীর প্লাজমা নিয়ে কুব্যবসাও বাদ যায়নি। চারদিকে উল্টা যতো ক্রিয়াকর্ম। মহামারী বরং অনেককে আরো বেপরোয়া করছে। মওকা করে দিচ্ছে কোটি-কোটি টাকা হাতানোর। পুকুর চুরির বদলে বেড়েছে সাগর চুরি। এই দুর্যোগের মাঝেও বোরোর বাম্পার ফলন ফলিয়েছে কারা? কৃষকরা। তাদের কল্যাণে কারো মন গলেছে? ধান-চালের বাজারে নতুন মজুতদার যোগ হয়েছে। তাদের একেকটা প্রতারণাবিশারদ। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ মৌসুমি ফলের বাজারেও কুকর্মের শিরোমনিদের দাপট। সঙ্গে আদর কদর। ক্যামিকেলের ছড়াছড়ি। এমন মহামারিও দুষ্টুচক্রের জন্য সুসংবাদ। প্রতিদিন মানুষ মরছে, বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অব্যাহত চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে, শিশু অপহরণ হচ্ছে, নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে, জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। কয়টা ঘটনা জনসমক্ষে প্রচারিত হয়? আর বিচারই বা কয়টার হচ্ছে?
এ কেমন ব্যবস্থা? কেমন মানসিকতা? কী নিদারুন রসিকতা? সব মিলিয়ে অবস্থাটা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, কোনো ঘটনাই আর দেশে ঘটনা নয়। আর দুর্ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দেশে এমন কোন ঘটনা ঘটছেও না যা কখনো ঘটেনি বাংলাদেশে। একদম নতুন তেমন ঘটনা নেই। যা ঘটছে প্রায় সবই বাসি ঘটনার চেয়ে একটু কম বা বেশি। শেষ পর্যন্ত ঘটনা কি এখানেই বা এমনই থাকবে? নতুন কিছু ঘটে বসে যদি? কোনো ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার, রিমান্ড, দল থেকে বহিস্কার ফয়সালা নয়। এসব করে প্রদীপদের গুলি করে সিনহা হত্যা, হাতুড়ি বাহিনীতে ওয়াহিদা- বদরুলদের পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনার ওপর ধামা বসিয়ে চাপা দেওয়ার ক্যারিশমা দেখানো যায়।কথার ছল বা মুখ পাণ্ডিত্যেও ঘটনাকে ফানসে করা দেয়া যায়। একটি ঘটনা এসে আরেকটি ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। সেই শাহবাগ আন্দোলন, হেফাজতের মতিঝিলপর্ব, পেট্রলবোমা, বন্দুকযুদ্ধসহ ঘটনার এই মেগাসিরিয়াল লেগেই আছে। কোনো কিছুরই মীমাংসা হয় না, কোনো ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয় না। মসজিদে বিস্ফোরনের আরো বহু আগে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনাকেও বলা হয়েছিল, উদ্বেগের কিছু নেই। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান একরামকে গুলি করে হত্যা করে পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলার ঘটনাও বিচ্ছিন্ন।
আপাত অর্থে, সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সাবেক মেজর হত্যা, ইউএনওকে হাতুড়িপেটা ছাড়াও মিন্নি, নুসরাত, খাদিজা, ত্বকী, ছেলেধরা সন্দেহে মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা, খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা বানানো, খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, অমুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম তুলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট দেওয়া, ক্যাসিনো, বালিশ- পর্দা কাণ্ড, রাস্তা-ব্রিজ-কালভার্টে লোহার জায়গায় বাঁশ দেয়া, বাসের ভেতর গণধর্ষণ, বাস থেকে যাত্রীকে ফেলে তার বুকের উপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেয়া, সবই একেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মশা মারা শিখতে,পুকুর কাটা শিখতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুর,নেদারল্যান্ড যাওয়াও বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নকল পিপিই, মাস্কের ব্যবসা হাতানো, সাহেদ-সাবরিনাদের করোনা ট্রস্ট জালিয়াতিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু, বিচ্ছিন্ন ঘটনার এই মেগাসিরিয়াল আর কতো? এমন বিচ্ছিন্নতায় আর কতো অবিচ্ছন্ন হওয়া? মোটকথা সব কিছুকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলার রোগ থেকে বুঝি মুক্তি মিলবে কবে? সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে আসল ঘটনা জানার সৌভাগ্য কবে হবে মানুষের? কবে আসবে নিরবিচ্ছন্নতা? না-কি বিচ্ছিন্নতার আড়ালে নিরবিচ্ছিন্ন অঘটনের জালে প্যাঁচিয়ে নেয়ার কোনো অপখেলা চলছে?

-রিন্টু আনোয়ার
লেখকঃসাংবাদিক ও কলাম লেখক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে