সাবেক মেজর সিনহা হত্যাঃ বিচারবহির্ভুত হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়া বুঝলে ভালো,না বুঝলেও কোন সমস্যা নাই..

0
137

একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাবেক মেজর সিনহা রাশেদকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অপরাধে রাষ্ট্র থেকে বারবার তওবা করা হচ্ছে। এমন কাজ আর করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। নিহতের পরিবারকে ফোন করে সমবেদনা জানানো, তদন্ত ও বিচারের প্রতিশ্রুতিও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এই খবরগুলোর সারকথা হচ্ছে, রাস্ট্র নিশ্চিত হয়েছে এটা একটা হত্যা এবং আগে একই কায়দায় দু’হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার সময় শোনানো গল্পগুলোও ছিল বানোয়াট। যা মেজর সিনহা হত্যায়ও শোনানো হয়েছে। কিন্তু, ধোপে না টেকায় গণ্ডগোল বেঁধেছে। একটি বিষয় নিয়ে সেনা এবং পুলিশ দুই প্রধানের রাজধানী থেকে কক্সবাজারের গিয়ে বৈঠক,যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও অপরাধ সংগঠিত হওয়ার স্থান পরিদর্শন এসবে ইতিহাস তৈরি হলো। অথচ টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের কাছে এসব ‘ক্রসফায়ার’ ছিল ডালভাতের মতো। কথিত বন্দুকযুদ্ধের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন তিনি। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হন। প্রদীপ কুমার দাশ প্রায় ২৫ বছরের চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে। বছর দুয়েক আগে টেকনাফ থানায় যোগ দেন। এই দুই বছরে দেড় শতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ঘটেছে এ থানা এলাকায়। সর্বশেষ ভিডিও বার্তায় তিনি চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টেকনাফকে মাদকমুক্ত করতে মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও হামলার হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন। মেজর (অব.) সিনহা মামলার আসামি হয়ে ফের এলেন আলোচনায়। প্রদীপ কুমার দাশ বিপিএম পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যে ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় দুর্ধর্ষ অ্যাকশন সিনেমার। অ্যাকশন সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ডাকাত, সন্ত্রাসী, ইয়াবা কারবারি, মাদক, অস্ত্র, গোলাগুলি-সবই আছে এগুলোয়। তাঁর সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের বাছাই কমিটির মন্তব্য ছিল, নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে বহুল আলোচিত ইয়াবার কেন্দ্রবিন্দু টেকনাফ থানা এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ অস্ত্রশস্ত্রসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অস্ত্র, গুলিসহ গ্রেপ্তার ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করেন। এতে বোঝার বাকি থাকে কিছু? দুই বছরে এক ওসি প্রদীপই মেরেছে দুই শ’র বেশী মানুষ! বছরে শতাধিক। মানুষ হত্যা করা ছাড়া এই লোকটার কি আর কোন কাজ ছিল না! হাতে অস্ত্র আর ক্ষমতা পেলে এভাবে মানুষ হত্যায় মেতে উঠতে হবে এই শিক্ষা এবং ট্রেনিং প্রদীপরা কোথায় পায়! রাষ্ট্রের এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার একধরনের সংস্কৃতি বহমান। বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কোট–আনকোট শুটার শব্দ ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে জনমনে যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন আছে, সে বিষয়ে পারঙ্গম ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হয়। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ কাকে বলে, তা আসলে কী, কতো প্রকার ও কী কী, কিভাবে সংঘটিত হয়, তা আজ আর কারোই অজানা নয়। গণমাধ্যম তাকে সরাসরি ফায়ার বা গুলি না বলে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, কখনো কথিত বা কোটেশন যুক্ত করে বলে।
বিচারবিহীন হত্যাযজ্ঞ সেই যে শুরু হলো তার আর রাশ ধরে টানা গেলো না। পঙ্গু রাখাল লিমনের কথাই নয় কেবল, বিনাবিচারের গুলিতে কত হাজার মরলো সেটাও বাঙালী-বাংলাদেশীরা স্মৃতিতে ঠাঁই দিতে রাজী নয়। এমনই তাদের মানবতা ও ন্যায়-অন্যায় বোধ। এই ম্লেছ উৎসবের সাম্প্রতিক বলি হলেন সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা সিনহা। মৃত্যুর সময় সিনহার পরনে ছিল সেনাবাহিনীর কমব্যাট টি সার্ট, কমব্যাট ট্রাউজার এবং ডেজার্ট বুট। পোশাকই যথেষ্ট ছিল গুলি না করার জন্য। কিন্তু কেন যেন বড্ড তাড়াহুড়ো ছিলো প্রাণে মেরে ফেলার। এজন্যই এই একটি হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুরো পুলিশ বাহিনীই এখন কাঠগড়ায়।
সিনহাকে হত্যা করার পর এই নিয়ে দেশে যে হৈচৈ পড়েছে, তিনি সেনাপরিবারের না হলে তা হতো কি-না, এ প্রশ্ন থেকে যায়। এরইমধ্যে ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মেজর সিনহাকে চারটি নয়,ছয়টি গুলি করা হয়েছে। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাসের নির্দেশে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী চারটি গুলি করেন। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে ওসি প্রদীপ নিজে আরো দুটি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। প্রশ্ন হলো ওসি প্রদীপ এত বেপরোয়া হলেন কেন? মেজর সিনহার প্রতি তার এত আক্রোশের কারন কি ? মেজর সিনহা কি তার সব দুর্বলতা জেনে ফেলেছিলেন? যার কারনে তিনি মনে করছিলেন সিনহাকে শেষ করে দেয়াই তার এখন বাঁচার উপায়! গাড়ি না থামানোর মামুলি কারনে মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনা তো বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাও আবার ইন্সপেক্টর চারটি গুলি করে হত্যার পর ওসি এসে আরো দুটি গুলি করে মৃত্যুকে ১০০% নিশ্চিত করা এটা সহজ কোনো বিষয় নয়। গণমাধ্যমগুলোর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওসি প্রদীপ কক্সবাজারের এক ত্রাস তথা মূর্তিমান আতংক হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন। মেজর সিনহার পরিচয় জেনে ঠান্ডা মাথায় গুলি করা হয়েছে। ইন্সপেক্টর এবং ওসি উভয়ের গুলির ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের পরিচয় উল্লেখ করেই বলছেন। তদন্তের নামে ঘটনা ধামাচাপা দেয়া এক্ষেত্রে হয়ত সম্ভব নাও হতে পারে! কেবল সিনহার হত্যার বিচার করে কিন্ত বিচারহীন হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেলে সত্যিকারের মানবতার জয় হবে না।
তবে এযাবৎ প্রাপ্ত তথ্যসূত্রগুলো বলছে, দুটি কারণ হতে পারে রাসেদ হত্যার। এক. ওসি প্রদীপ কুমার দাস রাসেদকে নিয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ গত একমাস ধরে রাসেদ কক্সবাজারে ঘুরেঘুরে হাইকিংয়ের যে ডকুমেন্টারি তৈরী করছিলেন, সেটা কি সত্যিই ডকুমেন্টারি ছিলো, না-কি প্রদীপের এবং পুলিশের অপরাধ জগতের জাল চিহ্নিত করা হচ্ছিলো? ওসি প্রদীপের ধারণা হয়ে থাকতে পারে ডকুমেন্টারির নামে মেজর রাসেদ প্রদীপকে ফাঁসানোর জাল তৈরী করছে। এবং ইতোমধ্যে রাসেদের কাছে অনেক তথ্যাদি পৌঁছে গেছে। এজন্য তাকে মেরে ফেলার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিল প্রদীপ। দুই. দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ এলাকায় হাকিম ডাকাত মানুষকে নিপীড়ন করেই যাচ্ছে। পুলিশ কোনোভাবেই তাকে ধরতে পারছে না। ওসির সন্দেহ হয়ে থাকতে পারে মেজর রাসেদের সাথে হাকিম ডাকাতের কোনো যোগসূত্র ঘটে থাকতে পারে। কারণ টেকনাফের বনে জঙ্গলে গত একমাস নিয়মিত ট্র্যাকিং এবং স্যুটিং করতো রাসেদ। অবশ্য কোনো সংস্থা বা বাহিনী থেকে ঘটনার কারণ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। পুলিশ বলছে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু বিপরীত পক্ষ এমন সরলীকরণ মেনে নেয়নি। ওরা বলছে, সামরিক পোশাক দেখা এবং পরিচয় দেয়া স্বত্বেও, কোনোপ্রকার কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ সামরিক বাহিনীর প্রতি চরম অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা এবং ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। শুধু তাই নয়, মৃত্যুপথযাত্রী রাসেদের মুখমন্ডলে ওসি প্রদীপ এবং এসআই লিয়াকতের এলোপাতাড়ি লাথি মারাও ছিলো ন্যাক্কারজনক। ঘটনাস্থলে পরিচয় দেয়ার পরও একজন এএসইউ সদস্যের সামরিক বাহিনীর পরিচয়পত্র ও ফোন ছিনিয়ে নেয়াও বাহিনীর প্রতি অবমাননাকর। মেজর রাসেদকে হাসপাতালে নেয়ার আগে যেন মৃত্যু নিশ্চিত হয় সেজন্য অহেতুক বিলম্ব করার ঘটনাও ছিলো পৈশাচিক। রাসেদ হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবীর সাথে এলোমেলো কথা ও কাঁদা ছোড়াছুড়ির মাত্রাও উদ্বেগজনক। পত্র পত্রিকা ইলেকট্রনিক মিডিয়া ফেসবুক ইউটিউব টুইটার সর্বত্রই এ নিয়ে হুড়োহুড়ি। দেশে রাজনীতির চর্চা না থাকলে মানুষ অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু নিয়ে হৈচৈ করবে, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারও বসে নেই, যেচে পড়েই কথা বলছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, একটি অশুভ চক্র নানা ইস্যুতে গুজব রটনা ও অপপ্রচারে লিপ্ত। সাবেক সেনাসদস্য মেজর রাশেদের মর্মান্তিক ঘটনাকে ঘিরে কেউ কেউ দুই বাহিনীর মধ্যে উসকানি দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে কেউ কেউ সরকার হটানোর মতো দিবা স্বপ্ন দেখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি কিন্তু সচেতনভাবেই এটিকে ‘মর্মান্তিক ঘটনা’ বলেছেন, হত্যাকাণ্ড বলেননি। মোটকথা চাতুরির শেষ নেই। চাতুরি বা মুখপণ্ডিতি যতোই চলুক এসব ব্যর্থতার দায় গিয়ে পড়ছে সরকারের ওপর। পুলিশের ঘটনায় মানুষ রাষ্ট্রকে বা সরকারকে পাশে পায় না। রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের পক্ষে সাফাই গায়। পুলিশও সর্বত্রই সরকারের সহায় হয়ে কাজ করে। ফলে মানুষ ভাবছে, দেশের পুলিশের কাছে তারা পুরোপুরি জিম্মি। এই অসহায়ত্বের কারণে মানুষ এই হত্যাকাণ্ডটিকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীকে তার ক্ষোভের সঙ্গী ভাবছে। রাসেদ হত্যার পর মানুষের মধ্যে যে ব্যপক প্রতিক্রিয়া এবং এই প্রতিক্রিয়ার যে বার্তা, সেটি সরকার এবং পুলিশ বাহিনী বুঝলে ভালো। না বুঝলেও কোন সমস্যা নাই।তবে বিচারবহির্ভুত হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় কি বার্তা গেলো জনগনের কাছে?
-রিন্টু আনোয়ার
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rintu108@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে