ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সাইবার ক্রাইম

0
637

দিন দিন বেড়েই চলছে সাইবার ক্রাইম। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ওয়েবসাইট হ্যাকিং, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং করে টাকা উত্তোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারসহ সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। অনিরাপদ হয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার। ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে অপপ্রচার চালানো, ছবি বিকৃতি এবং হুমকিমূলক বার্তা দিয়ে নারীদের হয়রানি করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সেই সঙ্গে কিশোর- কিশোরীরাও নানা রকম হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছে। মোবাইল ফোন মেরামত, হারানো ও পুরনো ফোন কেনা-বেচা করতে গিয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়ছেন সবাই। ছড়িয়ে পড়ছে ব্যক্তিগত গোপনীয় অনেক ছবি ও ভিডিও। জেন্ডারভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেশে সাইবার অপরাধের শিকার নারীর (৫১.১৩ শতাংশ) সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।
জাল অ্যাকাউন্ট ও হ্যাক করে তথ্য চুরির মাধ্যমে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ অবস্থায় আছে বাংলাদেশের নারীরা। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন নামক একটি বেসরকারি সংস্থা ২০১৮ সালের মে মাসে ‘বাংলাদেশ সাইবার অপরাধের প্রবণতা শীর্ষক’ এক গবেষণা প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী মেয়েরা। আর ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৮ বছরের কম মেয়েদের সংখ্যা ১০.৫২%, ১৮ থেকে ৩০ বছরের কম নারীর সংখ্যা ৭৩.৭১%, ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা ১২.৭৭% এবং ৪৫ বছরের বেশি নারীর সংখ্যা ৩%। নারী ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে নানাভাবে সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে গড়ে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্টে অপপ্রচারের শিকার হন ১৪.২৯ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ছবি বিকৃতির মাধ্যমে অনলাইনে অপপ্রচারে ১২.০৩ শতাংশ নারী আক্রান্ত হন। আর অনলাইনে নারীদের হুমকিমূলক বার্তা প্রাপ্তির হার ৯.৭৭ শতাংশ। গবেষণায় দেখা যায় তথ্য চুরির শিকার হন ৫.২৬ শতাংশ নারী। পর্নো ভিডিও এর মাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার হন ১.৫০ শতাংশ নারী।
এ ছাড়াও অনুমতি ছাড়া অনলাইনে নিজের ছবি প্রচার হয় ৩.৭৬ শতাংশ নারীর। তবে হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের ৩০ শতাংশই এর বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সে বিষয়ে জানেন না। বাকিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না ভেবে অভিযোগ করেন না। আবার অভিযোগ করেও আশানুরূপ ফল পাননি ৫৪ শতাংশ ভুক্তভোগী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- দক্ষতার অভাবে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাইবার অপরাধের বিষয়গুলো তদন্তে হিমশিম খেতে হয়। এ জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের সব থানায় সাইবার অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণের এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ধর্ষকরা ভুক্তভোগীকে ফাঁদে ফেলতে অনেক সময় ফেসবুক ব্যবহার করছে। ধর্ষণের শিকার নারীর সঙ্গে ফেসবুক-এর মেসেঞ্জারে খুদে বার্তা ও ভিডিওকল আদানপ্রদান করে দ্রুত প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলছে ধর্ষকরা। এরপর মেয়েটির সঙ্গে দেখা করে কথা বলে তার ওপর চালাচ্ছে বীভৎস নির্যাতন। আর নির্যাতনের সেই দৃশ্য তথা ভিডিও কেউ কেউ মোবাইলে ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ফেসবুক ও মোবাইলের অপব্যবহারের কারণে সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ দিন দিন মহামারী রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিকারের উপায় নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাব এবং লোকলজ্জা ও ভয়-ভীতির কারণে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের সঙ্গে জড়িতরা মনে করে এ ধরনের অপরাধ দমন করতে হলে সাইবার সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে নিরাপদ থাকার জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া ব্যবহার করা মেমোরি কার্ড কারও কাছে বিক্রি না করে তা ভেঙা ফেলাই ভালো। এ ছাড়া মোবাইল মেরামতের বিষয়েও সর্তক থাকা প্রয়োজন।
সম্প্রতি অনলাইনে নিরাপদ থাকার জন্য ডিএমপি থেকে ছয়টি সুপারিশ প্রদান করেছে।
সুপারিশগুলো হলো— ১. অন্য দেশের সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি’ করা। ২. আইএসপি ও মোবাইল কোম্পানির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ব্রাউজার লগ রাখা বাধ্যতামূলক করা। ৩. পাবলিক ওয়াইফাইগুলোকে নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা। এজন্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বাধ্যতামূলক করা। ৪. দেশে পুলিশের অধীনে ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা। ৫. আইসিটি ডিভিশনের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৬. আন্তদেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
প্রশিক্ষণ পাবে ১২ লাখ শিশু-কিশোরও : জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের একটি যৌথ প্রকল্পে বাংলাদেশের ১২ লাখ শিশু-কিশোরকে অনলাইনে নিরাপদ থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। চলতি বছরই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ছয় লাখ শিশু-কিশোরকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- ইন্টারনেট শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার যা তথ্য, শিক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে তাদের বিকাশে সহায়তা করতে পারে। তবে অনুপযুক্ত উপকরণ ও আচরণের মাধ্যমে ইন্টারনেট শিশুদের সহিংসতা, নিগ্রহ ও অপব্যবহারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বাবা-মায়েদের সংবেদনশীল করে তোলাও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য, কেননা ইন্টারনেটে শিশুরা কী ধরনের বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয় তা নিয়ে ভীতির কারণে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বাধা দেয়। শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় সহায়তা দিতে এই প্রকল্পের আওতায় চার লাখ বাবা-মা, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে