ভয়কে জয়ের গল্প : ন ডরাই

0
445

সাগরপাড়ের চঞ্চল ও একরোখা মেয়ে আয়েশা। সাগর তাকে ডাকে। সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে পারে না আয়েশা। সাগরের কাছে যাওয়াই তার আনন্দের উপকরণ। পরিবার, সমাজ আর সংসারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখে সার্ফিং। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে আয়েশা পদে পদে বাধা আর বিপত্তির মুখোমুখি হয়। তার পরিবার চায় না আয়েশা সার্ফিং করুক। বড় ভাই কথায় কথায় মারধর করেন। আয়েশার সার্ফিং বড় ভাইয়ের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে আয়েশাকে মারধর করে গৃহবন্দি করে রাখেন। একটা পর্যায়ে আয়েশার চেয়ে বয়সে অনেক বড় একজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। শ্বশুরবাড়িতে কারও মন পায় না। ধীরে ধীরে আয়েশা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। প্রচলিত ধারার বাইরে এমনই এক গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ন ডরাই’। নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা নারী স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের সিনেমায় খুব কমই স্থান পেয়েছে। এখানেই ব্যতিক্রম ‘ন ডরাই’। বিনোদনের আড়ালে এই ছবিতে নারীর মুক্তির কথা বলেছেন পরিচালক। তিনি চিত্রিত করেছেন বাধা আর বিপত্তি জয় করে একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
এই আয়েশা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল। এটাই তার প্রথম সিনেমা। প্রথম ছবিতেই আয়েশা চরিত্রে আলো ছড়িয়েছেন তিনি। ‘ন ডরাই’ ছবির প্রায় প্রতিটি দৃশ্যে তাকে সাবলীল মনে হয়েছে। বিশেষ করে স্বামীর অত্যাচারের এক পর্যায়ে যখন সে বলে ‘আঁই সাগরেরে ন ডরাই যে মাইফ্যুয়া, তোর মতো হারামজাদারে আঁই ডরামু?’ তখন হলভর্তি দর্শকের মধ্যেও প্রতিবাদের বোধ জেগে ওঠে। যদিও সুনেরার পরিপাটি সাজ চরিত্রের সঙ্গে ঠিক সেভাবে ফুটে ওঠেনি। বেশ কয়েকটি দৃশ্যে তাকে চড়া মেকআপে দেখা গেছে। একটু অগোছালো বা মেকআপহীন থাকলে তাকে আরও বাস্তব চরিত্র বলে মনে হতো। এই ছবির নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শরীফুল রাজ। যিনি এর আগে রেদওয়ান রনির ‘আইসক্রিম’ ছবিতে অভিনয় করে আলোচনায় এসেছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর কামব্যাক করেছেন ন ডরাই দিয়ে। প্রত্যাবর্তনটা বেশ ভালোই হয়েছে রাজের। সোহেলের ভূমিকায় প্রতিটি দৃশ্যে তাকে সাবলীল লেগেছে। তবে তার চরিত্রেরও কিছু দুর্বলতা ছিল।
‘ন ডরাই’ ছবির গল্প বেশ ভালো। এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন শ্যামল মিত্র। যিনি এর আগে বলিউডের ‘পিংক’ এবং কলকাতার ‘বুনোহাঁস’ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। তবে ‘ন ডরাই’ ছবির চিত্রনাট্য ঠিক সেভাবে জমেনি। বিশেষ করে ছবির দ্বিতীয়ার্ধে অপ্রয়োজনীয় কিছু সিকুয়েন্স যোগ করে লম্বা করা হয়েছে। পরিচালক চাইলে ছবির দৈর্ঘ্য আরও কমিয়ে আনতে পারতেন। চিত্রনাট্যে ছবির প্রধান চরিত্র আয়েশার সংগ্রাম কিংবা আয়েশা-সোহেলের প্রেম-ভালোবাসার দিকটা যতটা শক্তিশালী বা স্পষ্টভাবে যতটুকু আসার কথা ছিল, ততটা আসেনি। তবে তাদের গল্পটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখলে ভালো লাগে। তারা গল্পের শেষে এক হয়ে সমুদ্রের পাড়ে বসে। যে সমুদ্রের সঙ্গে মিশে আছে তাদের আত্মা। হয়তো তাদের গল্পটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে।
তানিম রহমান অংশু এর আগে নাটক বানিয়েছেন, মিউজিক ভিডিও বানিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। বড় পর্দায় তার প্রথম কাজ ছিল ‘আদি’, যদিও সিনেমাটা মুক্তি পায়নি শেষমেশ। তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘স্বপ্নের ঘর’। বলা যেতে পারে সিনেমায় তার শুরুটা আহামরি হয়নি। তবে ন ডরাই সিনেমা তাকে নতুন এক জায়গায় নিয়ে গেছে। ছবির প্রথমার্ধে কোনো গান নেই। চবির তিনটা গানই শেষার্ধে দেখানো হয়েছে। একটা গান প্রথমার্ধে রাখলে খারাপ হতো না। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ ভালো ছিল। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় একটু আরোপিত মনে হয়েছে। ছবির ক্যামেরার কাজও বেশ ভালো হয়েছে। এই ছবিতে দারুণ কিছু শট ব্যবহার করেছেন পরিচালক।
‘ন ডরাই’ ছবিতে কক্সবাজারকে সুন্দর করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে কালার কারেকশনটা আরও ভালো হতে পারত।
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, ‘ন ডরাই’ শব্দটিকে নারীরা স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। বাধা টপকানোর অনুপ্রেরণা পাবেন। সিনেমা দেখে প্রতিটি নারীই তাদের নিজের জীবনের সঙ্গে সামান্য হলেও মেলাতে পারবেন বলা যায়। আর সিনেমা দেখে হল থেকে বের হওয়ার পর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবে ‘আমি পারব’।
এই ছবির বিষয় যেহেতু চট্টগ্রাম অঞ্চলের; ছবির প্রায় ৯০ ভাগ শুটিং হয়েছে কক্সবাজারে। তাই ছবিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত তীরবর্তী স্থানীয় মানুষের কথ্য ভাষা ব্যবহূত হয়েছে। চাটগাঁইয়া ভাষার মতোই চাটগাঁইয়া ভাষার স্ল্যাংও সুন্দর। আঞ্চলিক ভাষার আলাদা মাধুর্য থাকে, আলাদা সৌন্দর্য থাকে। এই ছবির কিছু কিছু সংলাপে তার ছাপ আছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে