ভিসিদের জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকটঃ-

0
488

বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পাশাপাশি বিদ্যাপীঠের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবেন উপাচার্যরা, এমনটাই প্রত্যাশা সবার। কিন্তু এই উপাচার্যদের নানা অপ্রীতিকর কর্মকান্ডে বিব্রত শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ শিক্ষার্থীরাও। এখন অবস্থা এমন যে- শীর্ষ পদে আসীন এই উপাচার্যদের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংকটে পড়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ উন্নয়ন কাজের টাকা নয়-ছয় করা নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সমালোচনা চলছে।
কোনো কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে রয়েছে ক্যাম্পাসে না থাকার অভিযোগ। এবার উপাচার্যদের অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তদন্ত শেষে এর প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যা করছেন তা অনাকাক্সিক্ষত। এসব মেনে নেওয়া যায় না। অনেক উপাচার্যকে নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের পর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মন্জুরুল ইসলাম বলেন, আগে উপাচার্যদের আদর্শ ছিল। এখন অনেক উপাচার্য আদর্শ থেকে সরে এসেছেন। তারা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য সরকারের পেছনে ধরনা দেন। আর সরকারও তাকেই পছন্দ করে যে সরকারকে সহায়তা করবে। উপাচার্য তখন নিয়োগ পেয়ে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, সরকারের তোষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কারণ উপাচার্যরা শক্ত অবস্থান নিলে তাদের চেয়ার থাকবে না। তারা নৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে দলীয় কর্মীর ভূমিকা পালন করেন। জড়িয়ে পড়েন অনেক অনিয়মে। তাই বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইমেজ এভাবেই নষ্ট করে দিচ্ছেন অনেক উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ থেকে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়ার অভিযোগে সমালোচনায় পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদ হারালেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি উপাচার্যের বিরুদ্ধে। অনেকের দাবি, বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি করেছেন তিনি। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষকদের একাংশসহ শিক্ষার্থীরা। ফেসবুকে লেখার কারণে এক ছাত্রীকে বহিষ্কারের জের ধরে উত্তপ্ত ছিলো গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। উভূত পরিস্থিতিতে ছাত্রীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলেও শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগ দাবিতে অনড়। অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় অবশেষ তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। নিয়ম উপেক্ষা করে শিক্ষার্থী ভর্তি, নারী কেলেঙ্কারিসহ অনেক অভিযোগ ছিল এ উপাচার্যের বিরুদ্ধে।
টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন বিভিন্ন পদে নিয়োগ, আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে নীতিমালার লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ। নিয়োগের ক্ষেত্রে করেছেন আত্মীয়করণ। শিক্ষকরা বলেছেন, এই উপাচার্য স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। জানা গেছে, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে এ উপাচার্য বিলাসবহুল বাংলো নির্মাণ করলেও তিনি এ বাসভবনে থাকেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে মাত্র এক হাজার টাকায় ভাড়া থাকেন তিনি। বিলাসবহুল বাংলো ফেলে প্রশাসনিক ভবনে থাকা এ ভিসিকে নিয়ে হাস্যরস করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দিনাজপুরে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মু. আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, সম্প্রতি কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। লিখিত, মৌখিক ও প্রদর্শনী ক্লাস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত হয়েও যোগ্য ও মেধাবীদের বঞ্চিত করা হয়। এমনকি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাওয়া প্রার্থীকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ১৬ জন কর্মকর্তা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে না থাকার অভিযোগ। শিক্ষকরা বলেছেন, কোন সপ্তাহে একদিন, কখনো ১৫ দিনে একদিন সকালে এসে বিমানে ঢাকায় চলে যান তিনি। ঢাকায় একটি লিয়াজোঁ অফিস খুলে সেখানে নিয়োগ কার্যক্রমসহ নানা প্রশাসনিক কাজও করছেন তিনি। এতে নিয়ম অমান্যের পাশাপাশি সরকারি অর্থেরও অপচয় করছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিজের এনজিওর কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষক- কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ অব্যাহত। গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূরের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। নিজে একটি প্রকৌশল কোম্পানি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা টেন্ডারকাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। এ ছাড়াও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম ইমামুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান, ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদার, রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহাম্মদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে