ভারতের কাছ থেকে কি পেল বাংলাদেশ?

0
219

১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে এক ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের ফলাফল নিয়ে সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা বিভিন্ন ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এই বৈঠক থেকে বাংলাদেশের অর্জন কি? কেউ বলছেন, বাংলাদেশ বরাবরের মতো আশ্বাস ছাড়া কিছু পায়নি। তবে বাংলাদেশ যে লাভবান হয়নি, তা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের হতাশা প্রকাশ থেকেই মোটামুটি বোঝা যায়। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের আভ্যন্তরীণ আলাপ-আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে দিল্লীর সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও তা চলমান থাকায় আমরা হতাশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন হতাশা প্রকাশ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশের অর্জন কী। অবশ্য ভার্চুয়াল বৈঠকের আগে দুই দেশের মধ্যে ৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিইও ফোরাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাইড্রোকার্বন বিষয়ে সহযোগিতা, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাতি সংরক্ষণ বিষয়ে সহযোগিতা, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও ভারতের জাতীয় জাদুঘঘরের মধ্যে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ও বরিশালের স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট সংক্রান্ত সহযোগিতা চুক্তি। এসব চুক্তির বিশ্লেষণ করলে, বাংলাদেশ কি ভারতের কাছ থেকে তেমন কিছু অর্জন করতে পেরেছে?
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের গভীরতা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রায় সময়ই বলেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক সোনালী যুগ পার করছে। ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। শীর্ষ নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে এমন কথাও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক রক্তের রাখী বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার বলেছিলেন,ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে এমন উচ্ছ্বসিত বক্তব্য ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের মুখ থেকে প্রায়ই শোনা যায়। অন্যদিকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও বন্ধুত্বের সোনালী অধ্যায়ের কথা বলতে শোনা গেছে। দুই দেশের বন্ধুত্বের এমন গভীরতার মাঝে সচেতন মহল প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন, তাহলে ভারতের কাছ থেকে বন্ধুত্বের নির্দশন স্বরূপ বিগত এক দশকে বাংলাদেশ কি পেল? তারা এ হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখেছেন, ভারত বাংলাদেশকে তেমন কিছুই দেয়নি। এ পর্যন্ত ভারতের সাথে যত ধরনের চুক্তি হয়েছে, তাতে কেবল ভারতের স্বার্থই রক্ষা হয়েছে। ভারতই বেশি লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে যখন যা চেয়েছে, তাই পেয়েছে। করিডোরের নামে ট্রানজিট, স্থল ও পানিপথ থেকে শুরু করে নৌ এবং সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করার সব ধরনের সুযোগ পেয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহণের সহজ পথ পেয়েছে। এতে বাংলাদেশের তেমন কোনো লাভ হয়নি। অন্যদিকে, ভারতের কাছে বাংলাদেশের চাওয়া খুবই সামান্য। তিস্তা চুক্তি, অভিন্ন নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যা, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, এবং বাণিজ্যিক অসমতা দূর করা। দুঃখের বিষয়, ভারতের পক্ষ থেকে আমাদের এসব দাবীর কোনোটাই পূরণ হয়নি। এক তিস্তা চুক্তি করে তা দশ বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। বাস্তবায়নের শুধু কেবল আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে। অথচ তিস্তা চুক্তিটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে রয়েছে বহু যুগ থেকে। পানির অভাবে বছরের এক সময় তিস্তায় চর পড়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়। তখন মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। শুধু তিস্তা নয়, অন্যান্য নদ-নদীর পানি ভারত বাঁধ, গ্রোয়েন ইত্যাদি নির্মাণ করে একতরফাভাবে তা প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের নদ-নদীর অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীনের মুখে ঠেকেছে। দেশটির বৈরী পানিনীতির কারণে,গঙ্গার পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার চীনের আর্থিক সহযোগিতায় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারতের আপত্তিতে তা স্থগিত হয়ে রয়েছে অথচ তারা বছরের একটা সময় একতরফাভাবে নদ-নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের নদ-নদী বিলীন এবং মরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ঠিকই ভারতের প্রতি মানবিকতার নিদর্শন রেখে তাদের এক রাজ্যে পুরো বছর ধরে ফেনী নদীর পানি দিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ভারতের প্রতি মানবিক হলেও তারা বাংলাদেশের প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা দেখাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, সীমান্তে বিএসএফ বাংলাদেশীদের পাখির মতো গুলি করে মারছে। সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএসএফ ৪৫ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে, যা বিগত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ সীমান্ত হত্যাকান্ড শূন্যে নামিয়ে আনা এবং মরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করা নিয়ে ভারতের সাথে একটি চুক্তি রয়েছে। কিন্তু ভারত এ চুক্তি মানছে না। তারা নানা উছিলায় বাংলাদেশীদের হত্যা করে চলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোপুরি একপাক্ষিক। ভারতের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে দেশটি উচ্চ শুল্ক ধার্য্য করে রেখেছে। অন্যদিকে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক এই অসমতা দূর করার ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেই। শুধু এই বাণিজ্যিক অসমতাই নয়, বাংলাদেশ ভারতের রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে বলে পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। দেশটির হাজার হাজার কর্মী বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত। এসব কর্মী বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা আয় করে নিয়ে যাচ্ছে বলে পরিসংখ্যান বলছে। দেখা যাচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে তার সব চাহিদা আদায় করে নিলেও, বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে তাদের তেমন আগ্রহ নেই। বাংলাদেশের ন্যায্য দাবীগুলো পূরণে তারা সব সময় গড়িমসি করে চলছে অথচ চাহিবা মাত্র তাদের সকল স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের দাবীর ক্ষেত্রে কেবল আশ্বাসের নীতি অবলম্বন করে চলেছে ভারত। এরই মধ্যে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে নতুন করে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সংযুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিলি থেকে মেঘালয়ের মেহেন্দ্রগঞ্জে চলাচলের সুযোগ করে দিতে ঢাকাকে অনুরোধ করেছে দিল্লি। অন্যদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড এই ত্রিদেশীয় মহাসড়কে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উল্লেখিত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ত্রিদেশীয় মহাসড়ক ছাড়াই বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে। এক মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করলেই চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। এমনকি, ভারত যদি নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ৪৫ কিলোমিটার শিলিগুঁড়ি করিডোরটি উন্মুক্ত করে দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সাথে নেপাল, ভুটান ও চীনের যোগাযোগ সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু ভারত এ সুবিধাটুকুও বাংলাদেশকে দিতে অনীহ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিৎ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য ‘লুক ইস্ট’ পলিসির দিকে দৃষ্টি দেয়া।
মহামারি করোনা বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক মহামন্দার এ সময়ে যে দেশ যার কাছ থেকে বেশি সুবিধা পাচ্ছে, সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। পারস্পরিক ভারসাম্যমূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও স্বার্থের মাধ্যমে দেশগুলো একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এর অন্যতম উদাহরণ চীন। বৈশ্বিক মহামারিতে মহাপ্রতাপশালী যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো যেখানে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে চীন তার মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলা হচ্ছে, মহামারি পরবর্তী সময়ে চীনই হবে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তির দেশ। দেশটি সেভাবেই এগুচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তার এই এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে একতরফা কোনো বিষয় নেই। ফলে দেশগুলোও চীনের এ সহযোগিতা গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ সরকারও কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে চীনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে তার বাজারে বাংলাদেশের প্রায় আটশ’ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। অথচ এই দুঃসময়ে ভারতকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। অবশ্য প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের কাছ থেকে এখন তেমন কিছু প্রত্যাশা করে না।
-রিন্টু আনোয়ার
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে