প্রসঙ্গঃ ঢাকা-দিল্লি বন্ধুত্ব। এই ‘এখন’টা কখন?

0
153

রক্ত, বিশ্বাস, আস্থা, ভরসা, সাম্য ছাড়া বন্ধুত্ব হয় না। হলেও তা টেকে না। এগুলো ছাড়া স্বার্থগত মিত্রতা হতে পারে। তা মোটেই বন্ধুত্ব নয়। প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ঐতিহাসিক অনিবার্যতায় বা প্রয়োজনে। মিত্রদেশ বা মিত্রশক্তি নামে তারা একাত্তরে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করেছিল। এখানে ভারতবিরোধীতা বা বিপক্ষ মানসিকতা চর্চা করলে অবস্থা কী হতে পারে,সেটা বেশি উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর দরকার হয় না।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৩৯ কোটিরও বেশি। যা সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ। তাই অনেকেই ভারতকে দেশ না বলে মহাদেশ বলে থাকেন। আমাদের দেশের প্রায় সকল সীমানা ভারতীয় সীমানার সাথে বেষ্টিত। আমরাও ভারতসহ বিশ্বের সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখে একটি স্বাধীন সার্বভৌম উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উচু করে এগিয়ে চলছি।
বাংলাদেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতা জন্ম থেকেই, আবার ক্ষমতার রাজনীতিতে দুই পক্ষের কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। ধর্মকে ও ভারতকে নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে কিছু ছুঁত রয়েছে তাদের। বিএনপি মুখে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বললেও মূলত এই দলটি প্রায়োগিক অর্থে বিকশিত হয়েছে একটি ইসলামি জাতীয়তাবাদের আবরণে আর সেই রাজনীতি তারা প্রায়োগিকভাবেই করে চলেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মুখে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বলে কিন্তু প্রয়োজন হলে ধর্ম নিয়েও রাজনীতি করে। তবে বিএনপি যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে এটা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক, সংশয় বা বিভ্রান্তি বাংলাদেশের সমাজে নেই। কিন্তু
১৯৯১ সালের পর থেকে মুখে মুখে প্রতিদিন প্রতিবেলায় দেশে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার ঘোষণা দানকারী জামায়াতে ইসলামিকে দেশের ও জাতীর শত্রু হিসেবে আখ্যা দেয়ার পরেও বিএনপি’র বিরুদ্ধে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তত্বাবধায়ক সরকারের জন্য একসঙ্গে এক টেবিলে বসে এক রাস্তায় সংগ্রাম করতে দেখাগেছে। এরপর ২০০৫ সালের আগে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে মোট ৪ দফা চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির মধ্যে যে রাজনীতির মর্মকথা ছিল সেটা একটা থিওক্রেটিক স্টেটের (ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের)। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে যে ধরনের আইন কানুন হয়, সেই আইন-কানুনের একটা দার্শনিক ইশারা ছিল। একসময় হেফাজত ইসলাম রাজধানীর শাপলা চত্বরে দুইটা বড় বড় সমাবেশ করেছে। একটা হচ্ছে ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বরে। সেটা ছিল জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের সমাবেশ এবং সেখানে তারা ১৩ দফা দাবি দিয়েছিল।
হেফাজত ইসলাম যখন বিএনপি এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তখন আওয়ামী লীগ ১৩ দফার মধ্যে অনেক দফায়ই সমর্থন করেছিল। অথচ আওয়ামী লীগ যখন অন্য কোনো দলকে স্বাভাবিক ভাবে মাঠে নামতে দেয় না, মিছিল মিটিং সমাবেশ করতে দেয় না, একটা সময় ছিল মানববন্ধনও করতে বাধা ছিল। তখন তারাই হেফাজত ইসলামকে ২০১৩ সালের ৫ মে আরেকটা সমাবেশ করতে অনুমতি দিয়েছিল। সমাবেশের অনুমতি পেয়ে যখন সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কর্মী নিয়ে হেফাজত ইসলাম সরকার বিরোধী শ্লোগান দিয়ে ঢাকা অবরুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদেরকে বাড়ী পাঠানোর যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছিল তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা অনেকেই বলেছে তা এখানে উল্লেখ্য করার অবকাশ রাখে না। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির কৌশলটা এখানেই। যা চলছে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে ভারত নিয়েও। এ কৌশলে অবশ্য বিরতিহীনভাবে এগিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকার। যেমন আমাদের দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন বোঝাতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা উপমা ব্যবহার করেন। একবার বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। সম্প্রতি বলেছেন, রক্তের সম্পর্ক।

সরকার থেকে জোর গলায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘এখন’টা কখন? বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেও এ ‘এখন’ এর কথা বলেছেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেতো টানা বলেই আসছেন। সব উপমার সাথেই ‘এখন’ শব্দটা যোগ করছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত তথা শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। একাত্তরের রক্তের রাখি বন্ধনে আবদ্ধ এ বন্ধুত্ব বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ‘এখন’ উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। আরো প্রশ্ন হচ্ছে-বারবার কেন বলতে হচ্ছে, বন্ধুত্বের কথা? সুসম্পর্কের কথা? গোলমালটা কোথায়?
কোন কোন সময় আমাদের সাথে সীমান্ত হত্যাসহ নানা ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ,তাচ্ছিল্য,বৈষম্য,সাম্যহীনতার পরও ভারত আমাদের বন্ধু। এটাই বাস্তবতা। অসম হলেও প্রতিবেশীর মর্যাদা থাকতে হয়। সম্পর্ক বন্ধুত্বের এবং এই সম্পর্ক সম্মানজনক হতে হয় তাই এখন আমরা ভারত মহাদেশের প্রতিবেশী হিসাবে বিশেষ করে বন্ধুত্বের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে এসব ব্যপারে নিজেরাই কিছু নীতিমালা তৈরি করে নিয়েছি। দেশের গণমাধ্যমগুলোও তা খুব মানে। তারা ভারত বিরোধী কোন সংবাদ অথবা লেখা প্রকাশ করতে খুবই সাবধান।তারপরও প্রকাশ্যে স্বীকার করা না হলেও মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন দেখা দেয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশকিছু সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে আছে যেমন বাণিজ্য ঘাটতি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যাকণ্ডসহ কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত আছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে সংকট তৈরি হবে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করেছিলেন এবং মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিএনপি মহলে কিছুটা উল্লাসও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক জোরালো হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে আবার তা কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ককে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের বর্জন ও বিরোধিতার মুখে যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা দেশে-বিদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। সেসময় ভারতে কংগ্রেস দলের সরকার ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং। মনমোহন সিংয়ের সরকারের বলিষ্ঠ সমর্থন শেখ হাসিনার সরকারের জন্য একটি বড় সহায়ক শক্তি হয়েছিল এবং মোদী ভারতের ক্ষমতায় আসায় দিল্লিকে আরো পাশেই পেয়েছেন শেখ হাসিনা সরকার।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি প্রবল ছিল। তখন ভারতপন্থি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ছিল একপ্রকার কোণঠাসা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার পরও একশ্রেণির মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব ছিল চাঙ্গা।
কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো ভারতকে আস্থায় নিতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা আস্থায় নেয়ার গরজ মনে করেনি। ভারতবিরোধীতা তাদের একটা আইডেনটিটির মতো হয়েছে। এর জেরে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কোনো সমস্যার সমাধানও হয়নি। বরং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ায় দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের বদলে তিক্ততা বেড়েছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে টানা ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর।
এদিকে ভারতে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর দেশকে ‘হিন্দু’ রাষ্ট্রে পরিণত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপেও বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্ব অব্যাহত রেখেছেন। তা ভারতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন করার পরও। যদিও ভারতের কোন কোন রাজনৈতিক নেতা সে সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিলেন কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সেগুলো আমলে নেননি।
চীনের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক বিরোধ ও যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের অবস্থা আরো সুবিধাজনক হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি চীনের কাছেও বাংলাদেশের কদর বেড়েছে। এ অবস্থায় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব রক্তের। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক। ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন হচ্ছে, চীন ভারতকে ঘিরে ফেলতে চাচ্ছে। সমুদ্রে মুক্তার মালার মতো করে ভারতকে চারদিক থেকে বেঁধে ফেলতে চায়। পাকিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত আরব সাগর, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা হয়ে ভারত মহাসাগর, এরপর বঙ্গোপসাগরের কিনারে বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মধ্য দিয়ে চীন তা করবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। স্থলপথে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করে ভারতকে হাত-পা বেঁধে খোঁড়া করে ফেলতে চায় তারা। নেপাল ও ভুটানের আচরণকেও এ জন্য দায়ী করছেন ভারতের বিশেষজ্ঞরা।
এ রকম অবস্থার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই নিজেদের মধ্যে উষ্ণ বন্ধুত্ব থাকার জানান দিচ্ছে বার বার। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বে এ ধরনের বন্ধুত্বকে বিরল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ করতে পারছে না। সেই কবে থেকে ভারতের কাছে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করে আসছি আমরা অথচ সেটাকে সার্বক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় “দিমুনে” বা “সে হবেখন” বলে কখনও মমতার দোহাই, কখনও কথার মারপ্যাঁচ, কখনও স্রেফ গড়িমসি করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশি অনেকের মধ্যে এ নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতি অভিমান বাড়ছে। চীন-ভারত শত্রুতা বড় ধরনের সামরিক সঙ্ঘাত বা দীর্ঘমেয়াদি বড় বৈরিতায় রূপ নিলে অভিমানকারীদের প্রতিক্রিয়ার জবাবে চীন তাদের প্রতি দরদি হয়ে উঠতে পারে। এটি মোটেই চীনকে ভালোবাসার কারণে নয় বরং ভারতের ওপর অভিমান থেকে।ঋণসহায়তা, প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ, মহাকাশ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়দানের জন্যে বাংলাদেশের জনগণের বৃহদাংশ আগে থেকেই ভারতের জনগণের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।

-রিন্টু আনোয়ার
-লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rintu108@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে