দেশে সহিংস অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। -রিন্টু আনোয়ার

0
58

আমরা এখন কোন সমাজে এবং কোন দেশে বসবাস করছি, এ প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একের পর এক ভয়াবহ, নৃশংস ও বর্বর ঘটনা যেভাবে আমাদের গ্রাস করছে, তাতে এ প্রশ্ন তোলা অসংগত নয়। বিগত কয়েক বছর ধরে অপরাধের ধরণ এতটাই অমানবিক এবং নৃশংস হয়ে উঠেছে যে, এসব ঘটনায় বিবেকবান মানুষ মাত্রই শিউরে উঠছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। সরকার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-ের আইন করেও তা থামাতে পারছে না। প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ঘরের দরজা ভেঙ্গে কিংবা বাবার সামনে মেয়েকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তা বোধগম্য হচ্ছে না। মানুষের নীতি-নৈতিকতা কোন পর্যায়ে গেলে এমন মধ্যযুগীয় বর্বর ঘটনা ঘটতে পারে। ধর্ষকরা যেন আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। আবার সামান্য ঘটনায় বা গুজব রটিয়ে গণপিটুনি দিয়ে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যার ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চুরি সন্দেহে কিংবা সামান্য কথার সূত্র ধরে একজন জীবন্ত মানুষকে মুহূর্তেই হত্যা করা হচ্ছে। এই যে, লালমনিরহাটে কোরআন অবমাননার গুজব রটিয়ে শহীদুন্নবী জুয়েল নামে এক নিরীহ মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। অথচ পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোরআন অবমাননার কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইলে পুকুরের মাছ নিয়ে বিরোধের জেরে গ্রাম্য সালিশে আবদুল লতিফ খান নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমন নৃশংস হত্যাকা- এখন দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটছে। দেখা যাচ্ছে, ঘরে বাইরে কোথাও মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে জিঘাংসা বা হত্যার প্রবণতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এখন নিরাপদে চলাচল করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কে যে কখন গণপিটুনি বা হত্যার শিকার হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সারাদেশে গণপিটুনিতে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা জেলায় ৯ জন। ২০১৮ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৩৯ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৫ জন। গত বছরের জুলাই মাস প্রথম সাত মাসেই নিহত হয়েছে ৫৩ জন। গত বছর গণপিটুনিতে হত্যার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে মারা গেছে ২৫ জন। ঢাকায় নিহত হয়েছে ২২ জন। এরমধ্যে ২০১১ সালের ১৭ই জুলাই সাভারের আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ৬ ছাত্রকে গণপিটুনিতে হত্যার পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। এ ঘটনায় এখনো বিচার পায়নি নিহতদের পরিবার। এসব গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহে। দেখা যাচ্ছে, দেশে ধারাবাহিকভাবেই গণপিটুনির ঘটনা ঘটে চলেছে। কেন এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটছে? মানুষ কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, দেশের আইন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়া। অনেকে মনে করেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং একশ্রেণীর পুলিশের দুর্নীতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। অপরাধীর সঠিক অপরাধ আদালতে তুলে না ধরার কারণে সহজে বের হয়ে আসে এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে এ ধারণাও বদ্ধমূল বিচার বিভাগে সরকার সংশ্লিষ্টদের প্রভাবের কারণে সঠিক বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে অপরাধীদের মনে এ ধারণা কাজ করে অপরাধ করলেও সে পার পেয়ে যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টি একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব সৃষ্টি করেছে। ফলে অপরাধীকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে কিংবা তার অপরাধের ধরণ সনাক্ত না করেই তাৎক্ষণিকভাবে চরমপন্থা অবলম্বন করছে। গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধে তারা জড়াচ্ছে। আইনবিদরা মনে করছেন, দেশে সহিংস অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গণধর্ষণ ও গণপিটুনির মতো প্রকাশ্য অপরাধগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং দেশ পরিচালনায় আইনের শাসনের অভাব ও দুর্বলতা থেকেই এগুলো হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকার বড় পরিবর্তন না হলে তা কখনোই বন্ধ হবে না।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছে যে, স্বয়ং পুলিশ সদস্যদের অনেকে খুন, ধর্ষণ, মাদক সেবন ও চোরাচালানের মতো ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ যেন সর্ষের মধ্যেই ভূত বসবাস করছে। দেখা যাচ্ছে, পুলিশ হেফাজতে থেকেই কেউ নিরাপদ থাকছে না। সিলেটে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে যুবকের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়ার পর সাত মাস আগে রাজশাহীর গোদাগাড়িতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পরিকল্পিতভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা এ সপ্তাহে একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। গত জুলাইতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার ঘটনার রেশ এখনো রয়ে গেছে। যে পুলিশের কাজ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া এবং সেবা করা, তারা যখন নিজেরাই হত্যার মতো সর্বোচ্চ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের আতংকিত হওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকে না। একশ্রেণীর পুলিশের ভয়াবহ অপরাধের কারণে মানুষের মধ্যে এখন পুলিশ বলতেই ‘অনিরাপদ’ এমন মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। অথচ উন্নত বিশ্বে কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তারা মনে করে, তাদের বিপদে পুলিশই সবার আগে এগিয়ে আসবে এবং তাদের রক্ষা করবে। আমাদের দেশে ঘটছে উল্টো। এখানে কেউ বিপদে পড়লে উল্টো বিপদে এবং ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পুলিশের দ্বারস্থ হতে চায় না। নেহায়েৎ ঠেকায় না পড়লে কেউ পুলিশের কাছে যায় না। যদিও পুলিশকে জনবান্ধব করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অপরাধপ্রবণ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন এবং শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন, তারপরও তাদের মধ্যে তেমন হুঁশ আসছে বলে মনে হচ্ছে না।
দেশে খুন, ধর্ষণ, গণপিটুনি, মাদকের মতো অপরাধ যেভাবে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা মানুষকে অনিরাপদ করে তুলেছে। এতে সাধারণ মানুষও অসহনশীল হয়ে উঠেছে। দেশের আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং অপরাধী যেই হোক তার বিচার হওয়ার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করা সম্ভব। শুধু একটি দুটি ঘটনার বিচার করে ‘আমরা বিচার করেছি’ বলে সরকারের এমন বড়াই করার কিছু নেই। সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীর বিচার করা সরকারের স্বাভাবিক দায়িত্ব। এতে নিজের দলের লোকজনও যদি অপরাধী হয় তাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। দেখা যায়, বেশির ভাগ অপরাধের সাথে সরকারি দলের নেতা-কর্মী বা প্রভাবশালীদের কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ক্ষমতার জোরে তারা যেন ফ্রিভাবে অপরাধ করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। এ ধরণের প্রবণতাই দেশে ভয়াবহ অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। কাজেই সরকার যদি নিজ দলের লোকজনসহ অন্যান্য অপরাধ ও অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে কোনোভাবেই দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবে সাধারণ মানুষকেও বুঝতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া উচিৎ নয়। রোষের কারণে আইন তুলে নিয়ে নিজে অপরাধী হওয়া কোনোভাবেই বাঞ্চনীয় হতে পারে না। তাদের বুঝতে হবে, আমাদের দেশে আইন আছে, সংবিধান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে। আইন কখনো কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। গণপিটুনি স¤পূর্ণ আইন বহির্ভূত কাজ। যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এর জন্য হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটলে, তারাও একইভাবে হত্যাকা-ের জন্য দোষী হবে। অপরাধীকে দমন করতে গিয়ে নিজে অপরাধী হয়ে পড়া কাম্য হতে পারে না।
দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে তা সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। সামাজিক, পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক সবক্ষেত্রেই অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারকে স্বীকার করতে হবে। উট পাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে ঝড় উপেক্ষা করার প্রবণতা থেকে সরকারকে বের হয়ে এসে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও অপরাধ প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তার উপর দেয়া হয়েছে। এ দায়িত্ব পুলিশকে পালন করতে হবে। অন্যদিকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষ যাতে হাতে আইন তুলে নেয়, এজন্য পুলিশের নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সমাজের অভিভাবক শ্রেণীকেও সচেতন হতে হবে। মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টিতে তাদের কাজ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানুষের অধিকারের বিষয় সম্পর্কে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে