বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় মন্ত্রীর বক্তব্য চলমান কোন আইনকে রুদ্ধ করতে পারে?

0
110

বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে দেশের মানুষও এখন করোনায় গা ছাড়া। ক্ষেত্রবিশেষে ডেমকেয়ার। ঈদুল আজহা থেকে এটা চরম পর্যায়ে। কোরবানির পশুর হাট থেকে শুরু করে বাড়িতে ঈদ করতে যাতায়াত করা খুব কম মানুষকেই দেখা গেছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করতে। ঈদের পর সেই অবস্থা দেখা যাচ্ছে সরকারের মধ্যেও।
করোনায় মৃত্যু এবং আক্রান্ত কমে গেছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কেবল সন্তোষই নয়, বলেছেন, করোনা এমনি এমনি চলে যাবে! ভ্যাকসিন না-ও লাগতে পারে। এ নিয়ে অনেকে নানা কথা বলছেন, কেউ কেউ তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী কি বোকা? উত্তরে বলা হচ্ছে মোটেই নয়। বোকারা কি মন্ত্রী হতে পারেন? মন্ত্রী মহোদয় তার অভিজ্ঞতা থেকেই এমন মন্তব্য করেছেন। নানা অভিযোগ এবং উল্লেখ্য করার মত তেমন কোন সাফল্য ছাড়া এমনি এমনি মন্ত্রিত্ব বহাল থাকলে করোনা কেন এমনি এমনি যাবে না? যাবে, যেতেই হবে করোনাকে। গোটা দুনিয়া শেষ করে দিতে পারবে না। দেশ বা দুনিয়ার সব মানুষকে নিয়েও যেতে পারবে না। বরং তাকেই যেতে হবে। সেই বিবেচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন। কিন্তু তিনি কোন যুক্তিতে এমন হক কথার জানান দিলেন,সেটা পরিষ্কার করেননি এবং এই ভাইরাসটি যে নিজে থেকে চলে যেতে পারে এমন ভিত্তির তথ্যও দেননি। যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি জানা নেই দেশী-বিদেশী কোন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভালো বলেই হাসপাতালে ৭০% শয্যা খালি পড়ে আছে, এমনটা দাবি করে মন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে ৪০০০- ৫০০০ চিকিৎসক টেলি-মেডিসিন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মানুষ বাড়ি থেকে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কারণে হাসপাতালে ৭০% বেড খালি পড়ে আছে। এটা সরকারের সাফল্য উল্লেখ্য করে এর আগে, আরেকটি দারুন কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, এখন থেকে কোনো হাসপাতালে আর অভিযান হবে না। এককভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোথাও যাবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে, তারপর প্রয়োজনে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাবে। হাসপাতালে কোন অভিযান হবে না। শুধু ইনকোয়ারি হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন কথায় নিশ্চয়ই মনোবেদনায় ভুগছেন রিমান্ডে ভোগা রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোঃ সাহেদ। তার মন খারাপের কারণ- এমন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাসখানেক আগে কেন বললেন না? জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি যদি এই কথাটি বলতেন, তাহলে তো সাহেদের হাসপাতালে র‌্যাবের কোন অভিযানই পরিচালিত হতো না! বড়জোর একটা ইনকোয়ারি হতো। কি ভালোই না হতো তাহলে! কারণ ওরকম গোটা কয়েক ইনকোয়ারি রিপোর্ট তো তার পকেটেই থাকে সবসময়। কোন প্রকার পরীক্ষা না করেই তিনি যখন করোনভাইরাসের রিপোর্ট দিতে পেরেছেন, তখন তার হাসপাতালের ইনকোয়ারি রিপোর্ট তৈরি করে দেওয়া তো কোনো বিষয়ই ছিল না।
হাসপাতালে অভিযানের বিষয়টি প্রথম আসে রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে। হাসপাতাল নামধারী এই প্রতিষ্ঠানের ছিল না চিকিৎসার কোন সক্ষমতা, ছিল না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী। এমন কি বৈধ লাইসেন্সও ছিল না। তারপরও এই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছিল কোভিড-১৯ এর মত প্যানডেমিকের চিকিৎসার দায়িত্ব। এই স্বাস্থ্য মন্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন সেই রিজেন্টের সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। চুক্তিটি যে ঠিক হয়নি, রিজেন্ট হাসপাতালের যে চিকিৎসা করার ন্যূনতম সক্ষমতাই ছিল না, ২০১৬ সালের পরে তারা যে আর তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেনি, তারা যে টেস্ট না করেই করোনা পরীক্ষার মনগড়া রেজাল্ট দিত, এসব কিন্তু সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা মন্ত্রণালয় উদঘাটন করেনি। করেছে, র‌্যাব। সাধারণ মানুষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে, র‌্যাব গিয়ে প্রতারকদের ধরেছে। অথচ র‌্যাব যে কাজটি করেছে, সেটি কিন্তু সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত কাজের অংশ ছিল। কেবল রিজেন্টই নয়, র‌্যাব এরপর আরও কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়েছে। মোহাম্মদপুরেরটির মালিক সাবেক এক মন্ত্রী। গাজীপুরেরটির মালিকও সাবেক আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী! যেখানেই হাত পড়ছে, বের হয়ে আসছে দুর্গন্ধ। এ অবস্থায় অভিযান বন্ধ করা ছাড়া উপায় কী? যা চিঠির মাধ্যমে আরো বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, এরপর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এধরনের কোন অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে। কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অভিযান চালাতে হলে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। ৪ আগস্ট ইস্যু হওয়া ওই চিঠিটির দিকে তাকালেই দেখা যায়, চিঠির শুরুতেই বলা হয়েছে- ‘এ ধরনের অভিযানের কারণে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে এক ধরনের চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে।’ আসলে চাপা অসন্তোষটা কাদের মধ্যে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অযোগ্যতা নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে? যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো নিয়ম নীতি মেনে চলছে- তাদের মধ্যে? নাকি যারা হাসপাতালের নাম করে ডাকাতি আর বাটপারির প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে- তাদের মধ্যে? যদি অসন্তোষ মাপার কোন বাটখারা থাকতো- রিজেন্টের সাহেদের চেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট আর কেউ কি হতে পারতো? তাহলে কি মাত্র এক মাসের মধ্যেই সাহেদ দেখিয়ে দিচ্ছে- কত উপরে পর‌্যন্ত রয়েছে তার লোক? চুরি ধরে ফেললে চোরের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেবে- এটা অতি স্বাভাবিক বিষয়। তাই বলে কি চোর ডাকাতের মানসিক অবস্থাকে সম্মানজানিয়ে থানা-পুলিশ-আদালত সবাইকে নিস্ক্রিয় করে দিতে হবে?
ওই চিঠি আর মন্ত্রীর এই বক্তব্য, এর সরল অর্থ হচ্ছে- আর কোন হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযান যাবে না। তাই এখন যাচ্ছেও না। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, র‌্যব অভিযান চালায় মোবাইল কোর্ট অ্যাক্টের অধীনে। প্রশ্ন হচ্ছে,এ ধরনের একটা চিঠি কিংবা মন্ত্রীর বক্তব্য চলমান কোন আইনকে রুদ্ধ করতে পারে? এর জবাব হচ্ছে- পারে না। কিন্তু পারতে হয়। বুঝতে হয়। র‌্যাব কেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে? তাছাড়া ওই চিঠিটির একেবারে শেষ লাইনে বলা হয়েছে-এই বিষয়টা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা হয়েছে। তাহলে অর্থটা কি দাঁড়ালো? র‌্যাবকে প্রকারান্তরে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তোমাদের মন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তিনিও চান তোমাদের নিজে থেকে আর কোন অভিযান যেন চালানো না হয়। ফলে এর মাজেজা বুঝতে বিশেষ জ্ঞানী বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না। এরপরও কেউ বুঝলে ভালো,না বুঝলে অসুবিধা নেই। বরং যারা না বুঝেছেন তারা অবুঝ-অবোধই থেকে যাচ্ছেন।
চীনে করোনার হানার পর বাংলাদেশেও আসতে পারে বলে শঙ্কার সময়ও বর্তমান এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ধাঁচের কিছু বুঝ দিয়েছিলেন। এগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
শুরুতে বলেছেন-গুজব-অপপ্রচার। ২৮ জানুয়ারিতে বললেন-করোনা বাংলাদেশে আসবে না। ৩০ জুনে এসে বলেছেন, ভেন্টিলেটর দরকার নেই কারণ ভেন্টিলেটরে যাওয়া প্রায় সবাই মারা গেছেন। ১৩ আগস্টে বলেছেন,এখন দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে গেছে। তাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ বুলেটিন প্রচার বন্ধ। সর্বশেষ ১৫আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে এসে দিলেন শুভ সংবাদ! ভ্যাকসিন লাগবে না। করোনা এমনিতেই চলে যাবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এসব বয়ান আর বিভিন্ন ঘটনা এবং বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় মানুষও এখন আল্লাহর হাওলা হয়ে গেছে। করোনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে মানুষ ধরেই নিয়েছে করোনা হলেও যেহেতু চিকিৎসা পাওয়া যাবে না, অতএব এটাকে পাত্তা দেয়ার দরকার নেই। যা হবার হবে; আল্লাহ ভরসা। এই ‘যা হবার হবে’ এবং ‘আল্লাহ ভরসা’র গণমনস্তত্ত্ব তৈরির পেছনে দেশের প্রতিটি খাতে দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা দায়ী হলেও আখেরে এটি মানুষের মধ্যে করোনার বিরুদ্ধে টিকে থাকার অস্ত্র হিসেবেও কাজ করছে। এখানে প্রকৃতি নাকি ভাইরাসের দুর্বলতা অথবা মানুষের মনোবলজনিত ইমিউন সিস্টেম বড় ভূমিকা রেখেছে—তা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। তবে প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেছেন, এমনিতে কিভাবে করোনা চলে যাবে তা বুঝতে পারছি না। এই বুঝতে না পারাটা ডা. আবদুল্লাহর বিষয়। তবে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বুঝেছেন। অভাগা সাধারণ জনগণেরও বোঝার বাকি নেই। বাদবাকিদেরও না বুঝে কোনো উপায় নেই। করোনা এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার যে ভয়াবহ দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে, তাতে বিনা চিকিৎসায় কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা। তা যেহেতু হয়নি, ফলে এটি অন্তত বলা যায় যে, ইউরোপ আমেরিকায় করোনা যেভাবে মহামারি হয়েছে এবং গণহারে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে-হচ্ছে,বাংলাদেশে সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে কোন বৈজ্ঞানিক কারণ না থাকলেও যেসব কারণ রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান কারণ হতে পারে আমাদের দেশের সাধারন মানুষের শক্ত মনোবল এবং আল্লাহ্ ভরসার বরকত।

-রিন্টু আনোয়ার
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rintu108@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে