অর্থনীতিঃ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার কোনো মিল নেই।

0
575

দেশে এখন অনেক উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। ১০টি মেগা প্রকল্প, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বেশ কিছু সড়ক-মহাসড়কের সংস্কার কাজ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে আপাতদৃষ্টিতে অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ভাব রয়েছে। এটা মুদ্রার এক পিঠ, কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠের অবস্থা খুব একটা ভালো না। 
সামগ্রিকভাগে দেশের অর্থনীতির অনেক খাতই এখন বড় সঙ্কটে। বিশেষ করে, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ধস, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা, কোনো রকম ধুঁকে ধুঁকে চলছে দেশের পুঁজি বাজার, রাজস্ব আয়ে ধাক্কা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং পেঁয়াজ-চালসহ বেশ কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি চাপে ফেলেছে দেশের অর্থনীতিকে। এ ছাড়াও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় বাড়ছে বেকারত্বের হার। এ কারণে সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে অর্থনীতির সব খাত নিয়েই এখন আমরা উদ্বিগ্ন। দেশের অর্থনীতির সবগুলো খাতেই মন্দাভাব বিরাজ করছে। কোনো খাতেই উৎসাহব্যঞ্জক কিছু দেখা যাচ্ছে না। বিনিয়োগ কমে গেছে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে, ঋণ প্রবাহ কমে যাচ্ছে, টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, দুর্নীতি বাড়ছে, রাজস্ব আয়ে সবচেয়ে কম ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সরকার যে তথ্য দিচ্ছে তার সঙ্গে এসব অসঙ্গতিপূর্ণ। অর্থাৎ জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে হারের কথা বলছে সরকার, তার সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার কোনো মিল নেই। 
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রফতানি আয়ে। অব্যাহতভাবে কমছে রফতানি আয়। চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের প্রথম চার মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্জিত আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ কম। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সব ধরনের পণ্য রফতানিতে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ হাজার ৪৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু এ সময়ে এ খাতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৭২ কোটি ১২ লাখ ডলার। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় রফতানি বাণিজ্যের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রফতানি কমে যাওয়া। অক্টোবর শেষে পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ কম। এ সময় রফতানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে দশমিক ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অথচ গত বছরও পোশাক রফতানি থেকে আয় গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। 
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, পোশাক রফতানি কমছে। আগামীতে আরও কমবে। এখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু আগের চেয়ে অর্ডার কমেছে পাশাপাশি মূল্যও কম দিচ্ছে ক্রেতারা। প্রতিযোগী দেশ যেমন ভারত, ভিয়েতনামের সরকার পোশাকে নগদ সহায়তা দিচ্ছে কিন্তু আমরা কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। তাই আমরা রফতানিতে পিছিয়ে যাচ্ছি। আগামীতে হয়তো আমাদের জন্য আরও কঠিন সময় আসছে। 
রফতানির পাশাপাশি আমদানির চিত্রও ভালো না। বেশ কিছুদিন ধরেই আমদানিতে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তার আগের বছরের চেয়ে আমদানি ব্যয় মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছিল। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এই তিন মাসে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ৮ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ। আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়-রিজার্ভ। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০১৭ সালের গত ২২ জুন অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এরপর প্রতিবারই আকুর বিল শোধের পর রিজার্ভ নেমে আসে। ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।
পেঁয়াজসহ বেশ কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অক্টোবর মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। তা ছাড়া নভেম্বর মাসে এসে পেঁয়াজ-চালসহ আরও কিছু পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষের কষ্ট আরও বেড়েছে। পেঁয়াজের কেজি ২৫০ টাকায় ঠেকেছে। সব ধরনের চালের দাম সারা দেশের বাজারে বেড়েছে কেজি প্রতি ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত। 
সরকার চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাতের ব্যাপক সংস্কার করেছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু তাতে রাজস্ব তো বাড়েনি উল্টো আরও কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশের মতো। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই আয় প্রায় ২০ শতাংশ কম। অর্থাৎ গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
রাজস্ব কমার বিষয়ে দেশের অর্থনীতিবীদরা বলছেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য সরকার ভ্যাট আইনে সংস্কার এনেছে, কিন্তু আমি মনে করি, ভ্যাট আইন সংস্কারের নামে অপসংস্কার করা হয়েছে। এর ফলে রাজস্ব আয় বাড়েনি, উল্টো কমেছে। এ বিষয়ে আমি আগে থেকেই সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা আমলে নেওয়া হয়নি। 
দেশে কর্মহীনতা বা বেকারের সংখা বাড়ছে। প্রতিবছর চাকরির বাজারে ২২ লাখ মানুষ প্রবেশ করছে এবং তা ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর বিপরীতে ২০১৮ সালে ১৬ লাখ মানুষ চাকরি পেয়েছে। যুবকদের বেকারত্বের হার ক্রমেই বাড়ছে। 
পিআরআইয়ের তথ্য মতে গত দশ বছরের মধ্যে এখন কর্মসংস্থানের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। শ্রমিক ও পেশাজীবীদের দক্ষতায়ও প্রচুর ঘাটতি আছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। জিডিপিতে এ দুই শহরের অবদান যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ৮০ শতাংশ উৎপাদনশীল শিল্প এ দুই শহরে অবস্থিত। সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য যা মোটেও সমীচীন নয়। 
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা নেই। নেই জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-অবরোধ। বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যারও উন্নতি হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট নেই। কিন্তু এ সবের কোনো প্রভাব অর্থনীতির প্রধান সূচক বিনিয়োগে পড়েনি। যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আটকে আছে বিনিয়োগ। বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগও বাড়েনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কলকারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ৮ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে। গত অর্থবছর শেষে যা ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর এটাকেই ‘এই মুহূর্তে’ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পুঁজিবাজারের অবস্থা আরও করুণ। মূল্যসূচক কমছেই। লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে। ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। উল্টো দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততোই খারাপের দিকে যাচ্ছে। পুঁজিবাজারে অব্যাহত দর পতনের প্রতিবাদে মাঝেমধ্যেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিক্ষোভ করছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।
ব্যাংকিং খাত রীতিমতো ধুঁকছে। বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতার হার দিনকে দিন বাড়ছে। প্রভাবশালী, ওপর মহলে ভালো যোগাযোগ আছে এবং ধনী, এমন কিছু ব্যবসায়ী হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ফেরত দেওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেন না। এমনকি বাংলাদেশে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এখন নিচ্ছেন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান এসব ঋণগ্রাহকেরা। 
খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি পঞ্জিকা বর্ষের প্রথম ৬ মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে অবলোপণ বাদে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায়। আর অবলোপনসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগের বছরের জুন পর্যন্ত অবলোপণ বাদে খেলাপি ঋণ ছিল ৯০ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। ফলে ১ বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, টাকা না দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে।
অর্থনীতির এ অবস্থা কেন হলো এবং এভাবে চললে আগামীতে কি অবস্থা দাঁড়াতে পারে এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘ দিনের অবহেলা এবং পলিসিগতভাবে সংস্কারের অভাবেই আজকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দেশই অর্থনীতি চাঙ্গা করার স্বার্থে বিভিন্ন সংস্কার ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা দেখা যায়নি। ভ্যাট খাতে সংস্কার করতে গিয়ে সরকার রাজস্ব খাতে আরও জটিল অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
তারা আরো বলেন, সরকার যত দ্রুত অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করবে ততোই মঙ্গল হবে। শুধু কথা বললে তো আর দেশ চলবে না, দেশ চলবে নীতির ওপর। এখনও সময় আছে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।-copy

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে