অপরাধের অভিনবত্বঃ উত্থান ঘটেছে এখন দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত।

0
154

========================================
সাহেদগংদের র‍্যাব ধরলেও ধরিয়েছে সরকারই। কাজেই সরকারকে ঢালাও সমালোচনা তেমন খাটে না। তাকে না ধরলে কারো কিছু করার ছিল? কী হতো না ধরলে? ধরা বা তার প্রতিষ্ঠানে র‍্যাবের অভিযানের আগ পর্যন্ত কেউ টুশব্দও করেছেন? অন রেকর্ডে কোথাও একটু-আধটু সমালোচনাও হয়েছে? তার এতো কুকর্ম নিয়ে একটা সাদামাটা সংবাদও কি হয়েছে কোনো গণমাধ্যমে? তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারে সরকার বা কেউ কি মানা করেছিল? কোনো বারন ছিল? এধরনের বহু প্রশ্ন এখন জনমনে। অথচ একটা সময় ছিল গণমাধ্যমে কোন সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড় হতো। এরপর পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীকে ধরতো। আর এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীকে পাকড়াও করার পর প্রেসব্রিফিং না করা পর্যন্ত মিডিয়া যেন কিছুই জানে না,ফলে জানেনা জনগন। দেশের গণমাধ্যম জগতে এখন এ এক বিশাল অনৈতিক পরিবর্তন।
করোনা মহামারি দেশের স্বাস্থ্যখাতের গুরুচরণ দশাকে দিগম্বরের মতো খোলাসা করেছে। এই মহামারিটি না এলে হয় তো স্বাস্থ্যখাতে যা এতোদিন চলছিলো, নীরবে তাই চলতো। কোনো শব্দ হতো না। কেনাকাটা পুকুর-সাগর চুরি চলতেই থাকতো। সংবাদ কোথাও হতো না। করোনার উছিলায় মানুষ অন্তত স্বাস্থ্যখাতের চুরি-জোচ্চুরি,জালিয়াতির কিছু তথ্য জানতে পারছে। সেটাও আবার ভাসা ভাসা।
আলোচিত সাহেদের রিজেন্টসহ বেসরকারি পাঁচটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে কোন মধুতে করোনা টেষ্টের অনুমোদন দেয়া হয়েছে? আবার কেনইবা বাতিল করা হয়েছে?-এ প্রশ্নের নিস্পত্তি এখনো হয়নি। মানুষ যা বোঝার বুঝে নিচ্ছে।
এদিকে অতিব্যবহারের ‘জিরো টলারেন্স’ বেশ বাজার পেয়েছে। হুবহু অর্থ বা অনুবাদ না জানলেও পথে-ঘাটে তা বেশ চলছে। বড়-বড় মন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষব্যক্তিদের মুখে বেশ উচ্চারিত এ শব্দযুগলের মর্মার্থ হচ্ছে- ছাড় না দেয়া, রেহাই না দেয়া, ক্ষমা না করা ইত্যাদি। ছোট করলে এর অর্থ হতে পারে ‘ছাড়হীন’ বা ‘ছাড়-ছাড়া’ বা ‘ছাড়-শূন্য’ বা ‘শূন্য-ছাড়’ ইত্যাদি। এগুলোর একটিও বাংলার মৌলিক শব্দ নয়। ‘টলারেন্স’ শব্দের আগে ‘জিরো’ সংযোজন করায় শব্দটির অর্থের ব্যাপকতার পরিধি সীমিত হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে ধরা হবে, বিচারের আওতায় আনা হবে-এই বার্তা দিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্সের বার্তা দেয়া হয়। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এটা কি শুধুই বলার জন্য বলা কোনো মিথ? তাহলে এটা কার জন্য প্রযোজ্য? কার ওপর প্রযোজ্য? এর আগেও খুন-খারাবি,ডাকাতি,লুট এমন কি বড় বড় দূর্নীতির খবরের আগে-পরেও সরকারের জিরো টলারেন্সের কথা শোনানো হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে একের পর এক ঘটনা ঘটে।ঘটার পর গণমাধ্যমে সচিত্র খবর হয়। কয়েকদিন বেশ আপডেট পায় মানুষ। ফলে তারা উদ্বিগ্ন হয়, বিচার চায়, টিভির টকশো’ জমে। সভা- সমাবেশ,মানববন্ধনও হয় কখনও-কখনও। সবই ঘটছে জিরো টলারেন্সের মধ্যে। জিরো টলারেন্সের বাংলায় অর্থ করতে গেলে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এরপরই নতুন আর একটি ঘটনা এসে ধুয়েমুছে দিয়ে যায় আগেরটি। মানুষও ভুলে যায়। ক’দিন পর মনে হয় এধরনের ঘটনা যেন ঘটেইনি।
আলোচিত জালিয়াত-ভয়ঙ্কর প্রতারক সাহেদকে নিয়ে এখনও জিরো টলারেন্সের কথা এসেছে। মজার ব্যাপার হলো সাহেদ নিজেও দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের কথা খুব বলতেন টিভি টক শো’তে যেয়ে। “কাউকে ছাড়া হবে না, সবাইকে ধরা হবে”- এ ধরনের কথা প্রায় সব সময় শোনা যেতো এই প্রতারকের মুখে। করোনা টেস্ট জালিয়াতের কারণে সাহেদের আগে ধরা হয়েছে ডা. সাবরিনাকে। চলমান রিপোর্টিংগুলোতে তাদের গুরুত্বের চেয়ে অপরাধের অভিনবত্ব নিয়ে তথ্য বেশি। তাদের পোশাক-আশাক, লাইফ স্টাইলের দিকে মনোযোগ নির্মাণের চেষ্টাও বেশ। দুর্নীতির কুশীলবরা ধরা পড়লে দুর্নীতির নির্মাতারা জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে কিছু দৃশ্য তৈরি করেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েকদিনের হৈচৈ শেষে চলমান অমানবিক অপরাধের ঘটনাগুলো জনদৃষ্টির আড়ালে চলে যায়–এ শঙ্কার কারণে সরকারের উচিত অন্তত এই ভয়ঙ্কর অপরাধী সাহেদকে দিয়ে হলেও জিরো টলারেন্স প্রমাণের ব্যবস্থা করা। তাবেই জিরো টলারেন্স শব্দটির ইজ্জত বাঁচাবে।
সাহেদের বিচার কতদূর যাবে এখনো এটা বলা মুশকিল। তবে মূলত বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ভয় না থাকায় এই ধারার জালিয়াতদের উত্থান ঘটেছে দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত। সাহেদ-সাবরিনাদের অপকর্ম যেনতেন পর্যায়ের নয়। তাদের দুস্কর্মের জেরে ইতালিসহ কয়েকটি দেশে বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের প্রবেশাধিকার। এই প্রবেশাধিকারের সঙ্গে মানুষের জীবিকার প্রশ্নও জড়িত। এনিয়ে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের সংবাদ প্রচারও হয়েছে সেসব দেশে। একেবারেই অর্থের লোভে সাধারন মানুষের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে তারা করোনা নিয়ে জালিয়াতি বাণিজ্য করেছে। কোনো সিস্টেমের কতটা অধঃপতন হলে মানুষের দ্বারা এ ধরনের জালিয়াতি করা সম্ভব হয়ে ওঠে, ভাবাও কষ্টসাধ্য। অথচ আমাদের দেশের কিছু কিছু গণমাধ্যম একসময় সাহেদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একজন জনদরদী ব্যক্তি হিসেবে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশনও নিয়েছিল এই প্রতারক।তার হাসপাতালের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও করোনা চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালের লাইসেন্স দেয় আবার এই অধিদপ্তরই। অথচ দেশের এই দুর্যোগ মুহুর্তে একটি ভুয়া মেয়াদহীন অযোগ্য হাসপাতালের সাথে মন্ত্রী-সচিব-ডিজি আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে এখন তারা একে অপরের প্রতি দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা করছেন। কেবল করোনা টেস্ট জালিয়াতিই নয়, প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিম্ন মানের পিপিই-মাস্কসহ করোনা চিকিৎসার নানা সামগ্রী সাপ্লাই করেছেন এই সাহেদ। ফলে বহু সরকারী হাসপাতালে অনিরাপদ নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে রোগীর চিকিৎসা করতে যেয়ে আমাদের অনেক ডাক্তার-নার্সরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কেবল স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষাসহ অন্যান্য খাতেও ঢুকেছে এই সাহেদের প্রতারণার হাত।
সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে দেশে এই ধরনের সাহেদের পর সাহেদ গজাতেই থাকবে। সাবরিনা,পাপিয়ারা জন্ম নিতেই থাকবে। সাহেদ কিন্তু নিজে নিজেই ভয়ঙ্কর সাহেদ হয়নি। বহুজনের মদদ-সহায়তায় এই সাহেদদের উত্থান। ঘটনাচক্রে ধরা না পড়লে সাহেদ আরো অনেক দূর যেতেন। শুনেছি দেশের মন্ত্রী হওয়ারও স্বপ্ন দেখতো সে এবং সেজন্য অনৈতিক লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন টিভি টক’শোতে যেয়ে নিজেকে পরিচিতি করা ও সরকারের আস্থা অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। কিন্তু হিসাবে কোথাও না কোথাও গরমিল করে ফেলেছেন নিশ্চয়ই। ব্যাটে-বলে মিল খায়নি। যার যার হিস্যা ঠিক মত বুঝিয়ে দিলে হয়তো গোলমাল পাকতো না। এরপরও মুখোশধারী এই প্রতারক ধরা যখন পড়েই গেছে, তাই এখন অন্তত একটা দৃষ্টান্ত মূলক শান্তির ব্যবস্থা করা সম্ভবত বেশি কঠিন কাজ হবে না সরকারের জন্য। সাধারন মানুষের ধারনা,গতানুগতিকে এগুলে ভয়ঙ্কর সাহেদের তেমন কিছু হবে না। বছর কয়েক জেল খাটা ছাড়া। এতে মোটেই সরকারের জিরো টলারেন্সের অর্থ আর গতানুগতিক জেলখাটা শাস্তি এক পর্যায়ে পড়ে না। বিশেষ করে সাহেদদের মতো চতুরদের। কারণ ভাবতে অবাক লাগে মানুষের সামনে এতো বড় প্রতারনার জাল বিছানো এই ভয়ঙ্কর প্রতারক র‌্যাবের অভিযানের দিন স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রীকে ফোন করেছিল অভিযান বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে।
দেশে এর আগেও বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধে গ্রেফতার হওয়া আলোচিত সমালোচিত প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গদের জেলখানায় আয়েশের খবর অনেকেই জানেন। সেখানে তাদের কোনো কিছুর কমতি হয় না। এছাড়া, এ ধরনের প্রতাপশালীদের কারা হাসপাতাল বা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল অথবা বারডেম হাসপাতালে বসে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি-খবরদারি চালানোর তথ্যও একেবারে গোপন নয়। অসুস্থ সাধারণ কারাবন্দি কিংবা ভিআইপি বন্দিদের হাসপাতালে বা বিশেষ ব্যবস্থায় থাকার নিয়ম কারা বিধানে রয়েছে। কিন্তু কেউ যখন স্বেচ্ছায় অসুস্থ বনে যান অথবা নানা অজুহাতে রোগীর কাতারভুক্ত হন,সেখানে যা হয় সাহেদের তা হতে কতোক্ষণ?
তাই বলছি সরকার কি ইমেজের প্রশ্নে বা জিরো টলারেন্সের মর্যাদা রক্ষায় একটু ব্যতিক্রম করতে পারে না? এধরনের ভয়ঙ্কর ২/৪ জন সাহেদদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো মুখোশধারী বহু সাহেদরা জনগনের সাথে আর প্রতারণা করার সাহস করবে না। সাধারন মানুষের আরো ধারনা বর্তমান দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকার চাইলে কি-না পারে?
আবার এই আপাদমস্তক ঠকবাজ, ভয়ঙ্কর প্রতারক, জালিয়াতকে মিডিয়ার সামনে এনে লাইভ রিমান্ডের কথা বলছেন কেউ কেউ। আইনে হয়তো সেটা অনুমোদন পায় না। আবার সরকার চাইলে অনুমোদিত হতে কতোক্ষণ? দৃষ্টান্তের প্রশ্নে আরো কতো কিছুই করা যায়। ‘জিজ্ঞাসাদের জবাবে আসামী এই বলেছে, ওই বলেছে’ এসব কাহিনী শুনতে শুনতে মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। সাহেদ যে মাপের অপরাধি তা ওই জিজ্ঞাসাবাদের জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দৃষ্টান্তের কিছু থাকে না। গতানুগতিক ধারায় আলোচিত-সমালোচিত আসামী ধরার পর রিমান্ড শেষে দিনের পর দিন তাদের কোথায় রাখা হয় তার খোঁজ কেউ রাখে না, কোন মিডিয়ায়ও আসে না। ক’দিনের হইচই থেমে যাওয়ার পর তারা প্রায় সকল সুবিদাসহ থাকেন হাসপাতালের ক্যাবিনে। ওখানে বসেই তারা বিভিন্ন মহলের সাথে লবিং,নিজের মামলার জামিন,সবার সাথে মোবাইলে যোগাযোগসহ সকল কায়কারবারই চালান অবলীলায়।
পরিশেষে আবারও বলি, সাহেদ-সাবরিনারা ধরা না পড়লে এতো আলোচনায়ও আসতো না। চুপকি-চুপকি সব লেনাদেনা সাঙ্গ হতো। তাই ধরা যখন হয়েছেই তখন সরকারের এখন দায়মুক্ত হতে সমস্যা কী? সেই সুযোগের সঙ্গে তাদেরকে দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরির সুযোগও এখন সরকারের হাতেই। নইলে পাপের কলস পূর্ণ করে এরা ধরা পড়লেই বা কী? এর আগে কতোজনই তো ধরা পড়েছে। তাদের নিয়েও গণমাধ্যমে খবরের ছড়াছড়ি হয়েছে। এদের ধরার পুরো কৃতিত্ব র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ফলে সরকারেরও। আবার বদনামও সরকারেরই। কারণ, তাদের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে বেড়ে ওঠার দায়ও যে সরকারের। যুক্তি হচ্ছে-সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পরা আলোচিত/সমালোচিত এসব নেতা-কর্তা-ব্যক্তিরা এই পর্যায়ে উঠে আসার পিছনে সুযোগটা পেয়েছে সরকারি মহল থেকেই।

-রিন্টু আনোয়ার।
লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rintu108@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে